আর যখন তাদের কে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তাতে ঈমান আনো’ ,তারা বলে ‘আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা কেবল তাতে ঈমান আনি’। অথচ এর বাইরে যা কিছু আছে সবকিছুই তারা অস্বীকার করে, যদিও তা সত্য এবং তাদের নিকট যা আছে তার সত্যায়নকারী। বলুন, ‘ যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক, তবে কেন তোমরা অতীতে আল্লাহ্র নবীদেরকে হত্যা করেছিলে [১] ?’
টীকা দেখুন
[১] ‘আমরা শুধু তাওরাতের প্রতিই ঈমান আনব, অন্যান্য গ্রন্থের প্রতি ঈমান আনব না,’ ইয়াহুদীদের এ উক্তি সুস্পষ্ট কুফর। সেই সাথে তাদের উক্তি ‘যা (তাওরাত) আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে' - এ থেকে প্রতিহিংসা বুঝা যায়। এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, অন্যান্য গ্রন্থ যেহেতু আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়নি, কাজেই আমরা সেগুলোর প্রতি ঈমান আনব না। আল্লাহ্ তা'আলা তিন পস্থায় তাদের এ উক্তি খণ্ডন করেছেন।
প্রথমতঃ অন্যান্য গ্রন্থের সত্যতা ও বাস্তবতা যখন অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত, তখন সেগুলো অস্বীকার করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। অবশ্য দলীলের মধ্যে কোনো আপত্তি থাকলে তারা তা উপস্থিত করে দূর করে নিতে পারত। অহেতুক অস্বীকার করার কোনো অর্থ হয় না।
দ্বিতীয়তঃ অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে একটি হচ্ছে কুরআনুল কারীম, যা তাওরাতেরও সত্যায়ন করে। সুতরাং কুরআনুল কারীমকে অস্বীকার করলে তাওরাতের অস্বীকৃতিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তৃতীয়তঃ আল্লাহ্র সকল গ্রন্থের মতেই নবীগণকে হত্যা করা কুফর ! তোমাদের সম্পপ্রদায়ের লোকেরা কয়েকজন নবীকে হত্যা করেছে। অথচ তারা বিশেষভাবে তাওরাতের শিক্ষাই প্রচার করতেন। তোমরা সেসব হত্যাকারীকেই নেতা ও পুরোহিত মনে করেছ। এভাবে কি তোমরা তাওরাতের সাথেই কুফরী করনি? সুতরাং তাওরাতের প্রতি তোমাদের ঈমান আনার দাবী অসার প্রমাণিত হয়। মোটকথা, কোনো দিক দিয়েই তোমাদের কথা ও কাজ শুদ্ধ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরবর্তী আয়াতে আরও কতিপয় যুক্তির দ্বারা ইয়াহুদীদের দাবী খণ্ডন করা হয়েছে। [মাআরিফুল কুরআন]
অবশ্যই মূসা তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ [১] এসেছিলেন, তারপর তোমরা তার অনুপস্থিতিতে গো বৎসকে (উপাস্যরুপে) গ্রহন করেছিলে। বাস্তবিকই তোমরা যালিম [২]।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতে ‘স্পষ্ট প্রমাণ' কী তা ব্যাখ্যা করে বলা হয় নি। অন্য আয়াতে সেটা এসেছে। যেমন, বলা হয়েছে, “ তারপর আমরা তাদেরকে তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ভেক ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এগুলো স্পষ্ট নিদর্শন; কিন্তু তারা অহংকারীই রয়ে গেল, আর তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।" [সূরা আল-আরাফ: ১৩৩]
আরও বলা হয়েছে, “তারপর মূসা তার হাতের লাঠি নিক্ষেপ করল এবং সাথে সাথেই তা এক অজগর সাপে পরিণত হল এবং তিনি তার হাত বের করলেন আর সাথে সাথেই তা দর্শকদের কাছে শুভ্র উজ্জ্বল দেখাতে লাগল।" [সূরা আল-আরাফ: ১০৭-১০৮]
আরও এসেছে, “তারপর আমরা মূসার প্রতি ওহী করলাম যে, আপনার লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করুন। ফলে তা বিভক্ত হয়ে প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল।” [সূরা আশ-শু'আরা: ৬৩] অনুরূপ আরও কিছু আয়াতে।
[২] ইয়াহুদীদের দাবীর খণ্ডনে আয়াতে বলা হয়েছে যে, তোমরা একদিকে ঈমানের দাবী কর, অন্যদিকে প্রকাশ্য শির্কে লিপ্ত হও। ফলে শুধু মূসা ‘আলাইহিস সালামকেই নয়, আল্লাহ্কেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে চলেছ। কুরআন নাযিলের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে যেসব ইয়াহুদী ছিল, তারা গোবৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করেনি সত্য; কিন্তু তারা নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের সমর্থক ছিল। অতএব, তারাও মোটামুটিভাবে এ আয়াতের লক্ষ্য। [তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন ]
স্মরণ কর, যখন আমরা তোমাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলাম এবং তুরকে তোমাদের উপর উত্তোলন করেছিলাম, (বলেছিলাম,) ‘যা দিলাম দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর এবং শোন।’ তারা বলেছিল, ‘আমরা শোনলাম ও অমান্য করলাম’। আর কুফরীর কারণে তাদের অন্তরে গোবৎসপ্রীতি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। বলুন, ‘যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে তোমাদের ঈমান যার নির্দেশ দেয় তা কত নিকৃষ্ট!’
আর আপনি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি অন্যসব লোকের চেয়ে বেশী লোভী দেখতে পাবেন, এমনকি মুশরিকদের চাইতেও। তাদের প্রত্যেকে আশা করে যদি হাজার বছর আয়ু দেয়া হত; অথচ দীর্ঘায়ু তাকে শাস্তি হতে নিস্কৃতি দিতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
বলুন, ‘যে কেউ জিবরীলের [১] শত্রু হবে, এজন্যে যে, তিনি আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে আপনার হৃদয়ে কুরআন নাযিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবেরও সত্যায়ণকারী এবং যা মুমিনদের জন্য পথপ্রদর্শক ও শুভ সংবাদ’ [২]
টীকা দেখুন
[১] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, জিবরীল’ শব্দটি আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান এর মতই। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
[২] এ আয়াত নাযিল হওয়ার একটি কারণ এই বলা হয় যে, ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আবুল কাশেম। আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি, যদি সেগুলোর জবাব আপনি দিতে পারেন তবে আমরা আপনার অনুসরণ করব, আপনার সত্যতার সাক্ষ্য দিব এবং আপনার উপর ঈমান আনব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যেমন ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম তার সন্তানদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন, তিনি বলেন, “আমরা যা বলছি তাতে আল্লাহ্ই কৰ্মবিধায়ক।" [সূরা ইউসুফ:৬৬]
তখন তারা বলল, আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলামত কী বলুন। রাসূল বললেন, “তার চক্ষু ঘুমায় কিন্তু তার অন্তর ঘুমায় না”। তারা বলল, কীভাবে একজন নারী মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয় আর কীভাবে পুরুষ সন্তানের জন্ম দেয়? রাসূল বললেন, দুই বীর্য মিলিত হওয়ার পরে যদি মহিলার বীর্য পুরুষের বীর্যের চেয়ে বেশী প্রাধান্য বিস্তারকারী হয় তবে মেয়ে সন্তান হয়। আর যদি পুরুষের বীর্য মহিলার বীর্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তবে পুত্র সন্তান হয়। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। ---- তারা বলল, ইসরাঈল (ইয়াকুব) কোন বস্তুকে তার নিজের উপর হারাম করেছেন সেটা আমাদের জানান। তিনি বললেন, ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম বেদুইন এলাকায় বাস করতেন। তখন তার ইরকুন নিসা’ নামক রোগ হয়। ফলে তিনি দেখলেন যে, উটের গোস্ত ও দুধ তার জন্য এ রোগের কারণ হয়েছে, তখন তিনি সেটা নিজের উপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। তারা বলল, আপনার কাছে কোন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসে তার সম্পর্কে আমাদের জানান। কেননা, প্রত্যেক নবীর কাছেই কোনো না কোনো ফেরেশতা তার রবের কাছ থেকে ওহী ও রিসালত নিয়ে আগমন করে থাকে। এ ব্যাপারে আপনার সঙ্গীটি কে? এটি বাকী রয়েছে। যদি এটা বলেন তো আমরা আপনার অনুসরণ করব। রাসূল বললেন, তিনি তো জিবরীল। তারা বলল, এই তো সে যে যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়ে আসে। সে ফেরেশতাদের মধ্যে আমাদের শক্র। আপনি যদি বলতেন যে, তিনি মীকাইল, তবে আমরা আপনার অনুসরণ করতাম। কারণ তিনি বৃষ্টি ও রহমত নিয়ে আসে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন। [মুসনাদে আহমাদ ১/২৭৪, তিরমিয়ী ৩১১৭]
আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে কেউ জিবরালের শক্র হবে; সে শুধু এজন্যই শক্র হবে যে, তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে যার উপর ইচ্ছা ওহী নিয়ে অবতরণ করে থাকেন। যারা আল্লাহ্র ফেরেশতা ও তার বিধানের বিরোধিতার জন্য জিবরীলের সাথে শক্রতা করবে তার ব্যাপারে শরীআতের হুকুম কি তা পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হবে।
‘যে কেউ আল্লাহ্, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর রাসূলগণ এবং জিব্রীল ও মীকাঈলের শত্রু হবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ কাফিরদের শত্রু’ [১]।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াত দ্বারা বুঝা গেল যে, যারা ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনবে না তারা কাফের। ফেরেশতারা হলো নূরের তৈরী। যারা কোনো অপরাধ করে না। তারা আগবাড়িয়ে কিছু করে না। তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয়, তাই শুধু তারা পালন করে। সুতরাং যারা ফেরেশতাদের সাথে শক্রতা করে, তারা মূলতঃ আল্লাহ্র সাথেই শক্ৰতা করল।