যারা দুর্বল, যারা পীড়িত এবং যারা অর্থ সাহায্যে অসমর্থ, তাদের কোনো অপরাধ নেই, যদি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের হিতাকাঙ্খী হয় [১]। মুহসিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো পথ নেই; আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
টীকা দেখুন
[১] এখানে সে সমস্ত নিষ্ঠাবান মুসলিমদের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, যারা প্রকৃতই অপরাগতার দরুণ জিহাদে অংশ গ্রহণে অসমর্থ ছিল। এদের মধ্যে কিছু লোক ছিল অন্ধ বা অসুস্থতার কারণে অপারগ এবং যাদের অপরাগতা ছিল একান্ত সুস্পষ্ট। আর কিছু লোক ছিল যারা জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিল, বরং জিহাদে যাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়েছিল, কিন্তু তাদের কাছে সফর করার জন্যে সাওয়ারীর কোনো জীব ছিল না। বস্তুতঃ সফর ছিল সুদীর্ঘ এবং মওসুমটি ছিল গরমের। তারা নিজেদের জিহাদী উদ্দীপনা এবং সওয়ারীর অভাবে তাতে অংশগ্রহণে অপরাগতার কথা জানিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবেদন করে যে, আমাদের জন্য সওয়ারীর কোনো ব্যবস্থা করা হোক। তাফসীরের গ্রন্থসমূহে এ ধরনের একাধিক ঘটনার কথা লেখা হয়েছে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; আত-তাফসীরুস সহীহ] তবে আয়াতে একটি শর্ত দেয়া হয়েছে যে তাদের আল্লাহ ও তার রাসূলের হিতাকাঙ্খী হতে হবে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হিতাকাঙ্খাকেই দীন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, দীন হচ্ছে নসীহত বা হিতাকাঙ্খা, আমরা বললাম: কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম ইমামদের জন্য এবং সর্বসাধারণের জন্য। [মুসলিম ৫৫]
আর তাদেরও কোনো অপরাধ নেই যারা আপনার কাছে বাহনের জন্য আসলে আপনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের জন্য কোনো বাহন আমি পাচ্ছি না’; তারা অশ্রুবিগলিত চোখে ফিরে গেল, কারণ তারা খরচ করার মত কিছুই পায়নি [১]।
টীকা দেখুন
[১] আলোচ্য আয়াতে তাদের কথাই বলা হয়েছে যাদের অপারগতা আল্লাহ্ কবুল করে নিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও যুদ্ধে বের হওয়ার পর যারা আগ্রহ থাকা সত্বেও যুদ্ধে আসতে পারেনি তাদের ব্যাপারটি মনে রাখার জন্য সাহাবায়ে কিরামকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মদীনাতে এমন একদল লোক রয়েছে, তোমরা যে উপত্যকাই অতিক্রম কর না কেন, যে জায়গায়ই সফর কর না কেন তারা তোমাদের সাথে আছে। তারা বলল, তারা তো মদীনায়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদেরকে ওযর আটকে রেখেছে।' [বুখারী ২৮৩৯; মুসলিম ১৯১১] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তারা তোমাদের সাথে সওয়াবে শরীক হবে। অসুস্থতা তাদেরকে আটকে রেখেছে।’ [মুসলিম ১৯১১; ইবন মাজাহ ২৭৬৫] এ আয়াতের পরে এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে যে, বিপদ শুধু তাদের ক্ষেত্রে যারা সামর্থ্য ও শক্তি থাকা সত্ত্বেও জিহাদে অনুপস্থিত থাকাকে নারীদের মত পছন্দ করে নিয়েছে।
যারা অভাবমুক্ত হয়েও অব্যাহতি প্রার্থনা করেছে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণ আছে। তারা অন্তঃপুরবাসিনীদের সাথে থাকাই পছন্দ করেছিল; আর আল্লাহ্ তাদের অন্তরের উপর মোহর এঁটে দিয়েছেন, ফলে তারা জানতে পারে না।
তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসলে তারা তোমাদের কাছে অজুহাত পেশ করবে [১]। বলুন, ‘তোমরা অজুহাত পেশ করো না, আমরা তোমাদেরকে কখনো বিশ্বাস করব না; অবশ্যই আল্লাহ্ আমাদেরকে তোমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ অবশ্যই তোমাদের কাজকর্ম দেখবেন এবং তাঁর রাসূলও। তারপর গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানীর কাছে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে, অতঃপর তোমরা যা করতে, তা তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন [২]।‘
টীকা দেখুন
[১] আব্দুল্লাহ ইবন কা’ব ইবন মালেক বলেন, আমি কাব ইবন মালেককে তাবুকের যুদ্ধে পিছিয়ে থাকা সম্পর্কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর শপথ! ঈমান আনার পরে আল্লাহ আমার উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সত্য কথা বলার মত নে'আমত আর অন্য কিছু দেন নি। যখন অপরাপর মিথ্যুকরা মিথ্যা কথা বলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যখন তার কাছে ওহী নাযিল হয়েছিল এ বলে যে, তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসলে অচিরেই তারা তোমাদের কাছে আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপেক্ষা কর। কাজেই তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; নিশ্চয় তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নামই তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের কাছে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও। অতঃপর তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ তো ফাসিক সম্পপ্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না। [বুখারী ৪৬৭৩]
[২] এ আয়াতে সে সব লোকদের আলোচনা করা হচ্ছে, যারা জিহাদ থেকে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে নিজেদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে মিথ্যা ওযর আপত্তি পেশ করছিল। এ আয়াতগুলো মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই অবতীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে পরবর্তী সময়ে সংঘটিতব্য ঘটনার সংবাদ দিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, আপনি যখন মদীনায় ফিরে যাবেন, তখন মুনাফিকরা ওযর-আপত্তি নিয়ে আপনার নিকট আসবে। [ফাতহুল কাদীর] বস্তুতঃ ঘটনাও তাই ঘটেছিল। এ আয়াতগুলোতে তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, যখন এরা আপনার কাছে ওযর আপত্তি পেশ করার জন্য আসে, আপনি তাদেরকে বলে দিন যে, মিথ্যা ওযর পেশ করো না। আমরা তোমাদের কথাকে সত্য বলে স্বীকার করব না। কারণ, আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে আমাদেরকে তোমাদের মনের গোপন ইচ্ছা বাতলে দিয়েছেন। ফলে তোমাদের মিথ্যাবদিতা আমাদের কাছে প্রকৃষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই কোনো রকম ওযর আপত্তি বর্ণনা করা অর্থহীন। তবে এখনও অবকাশ রয়েছে যেন তারা মুনাফিকী পরিহার করে সত্যিকার মুসলিম হয়ে যায়। ফলে আল্লাহ্ তাআলা এবং তাঁর রাসূল তোমাদের কার্যকলাপ দেখবেন যে, তা কি এবং কোনো ধরনের হয়। যদি তোমরা তাওবাহ করে নিয়ে সত্যিকার মুসলিম হয়ে যাও, তবে সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা করা হবে; তোমাদের পাপ মাফ হয়ে যাবে। অন্যথায় তা তোমাদের কোনো উপকারই সাধন করবে না। [দেখুন, তাবারী; ফাতহুল কাদীর; সাদী]
তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসলে অচিরেই তারা তোমাদের কাছে আল্লাহ্র শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের উপেক্ষা কর [১]। কাজেই তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর। নিশ্চয় তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নামই তাদের আবাসস্থল।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, এসব লোক আপনার ফিরে আসার পর মিথ্যা কসম খেয়ে খেয়ে আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাইবে এবং তাতে তাদের উদ্দেশ্য হবে, আপনি যেন তাদের জিহাদের অনুপস্থিতির বিষয়টি উপেক্ষা করেন এবং সেজন্য যেন কোনো ভর্ৎসনা না করেন। এরই প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে যে, আপনি তাদের এই বাসনা পূরণ করে দিন। অর্থাৎ আপনি তাদের বিষয় উপেক্ষা করুন। তাদের প্রতি ভর্ৎসনাও করবেন না কিংবা তাদের সাথে উৎফুল্ল সম্পর্কও রাখবেন না। কারণ, ভর্ৎসনা করে কোনো ফায়দা নেই। তাদের মনে যখন ঈমান নেই এবং তার বাসনাও নেই, তখন ভর্ৎসনা করেই বা কি হবে। [দেখুন, তাবারী; ফাতহুল কাদীর; সা’দী]
তারা তোমাদের কাছে শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও। অতঃপর তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ্ তো ফাসিক সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না [১]।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, এরা কসম খেয়ে খেয়ে আপনাকে এবং মুসলিমদেরকে রাজী করাতে চাইবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা হেদায়েত দান করেছেন যে, তাদের প্রতি রাজী হবেন না। এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি রাজী নন। তাছাড়াও তারা যখন নিজেদের কুফরী ও মুনাফিকীর উপরই অটল থাকল, তখন আল্লাহ তা'আলা কেমন করে রাজী হবেন? আর ঈমানদাররাই বা কি করে রাজী হতে পারে, যখন ঈমানদাররা সেটাতেই রাজী হয়ে থাকে যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল রাজী? [দেখুন, তাবারী; ফাতহুল কাদীর; সা’দী]
আ’রাব [১] বা মরুবাসীরা কুফরী ও মুনাফেকীতে শক্ত এবং আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের উপর যা নাযিল করেছেন, তার সীমারেখা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অধিক উপযোগী [২]। আর আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
টীকা দেখুন
[১] اعراب শব্দটি عرب শব্দের বহুবচন নয়; বরং এটি একটি শব্দ পদ বিশেষ যা শহরের বাইরের অধিবাসীদের বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। এর একজন বুঝাতে হলে اعرابي বলা হয়। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
[২] আলোচ্য আয়াতে মরুবাসী বেদুঈনদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এরা কুফরী ও মুনাফিকীর ব্যাপারে শহরবাসী অপেক্ষাও বেশী কঠোর। এর কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এরা এলম ও আলেম তথা জ্ঞান ও জ্ঞানী লোকদের থেকে দূরে অবস্থান করে। ফলে এরা আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত সীমা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। কারণ, না কুরআন তাদের সামনে আছে, না তার অর্থ মর্ম ও বিধি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে, বিশেষ করে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন। এ জন্যই কাতাদা বলেন, এখানে রাসূলের সুন্নাত সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা বোঝানো হয়েছে। [তাবারী] এক হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “যে কেউ মরুবাসী হবে সে অসভ্য হবে, যে কেউ শিকারের পিছনে ছুটবে সে অন্যমনস্ক হবে, আর যে কেউ ক্ষমতাশীনদের কাছে যাবে সে ফিৎনায় পড়বে।" [আবুদাউদ ২৮৫৯] আর যেহেতু অসভ্যতা বেদুঈনদের সাধারণ নিয়ম, তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্য থেকে কোনো নবী-রাসূল পাঠান নি। আল্লাহ বলেন, “আর আমরা আপনার আগে কেবল জনপদবাসীদের মধ্য থেকে পুরুষদেরকে রাসূল বানিয়েছিলাম।" [সূরা ইউসুফ ১০৯] অন্য হাদীসে এসেছে, একবার এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিছু হাদীয়া দেয়। তিনি তাকে রাজী করতে দ্বিগুণ প্রদান করেন। তখন তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, হাদীয়া শুধু কুরাইশী অথবা সাকাফী অথবা আনসারী বা দাওসী থেকেই নেব।’ [তিরমিযী ৩৯৪৫] কারণ, এ গোত্রগুলো লোকালয়ে বাস করার কারণে তাদের মধ্যে সভ্যতা-সংস্কৃতি রয়েছে। [ইবন কাসীর]
আর মরুবাসীদের কেউ কেউ, যা তারা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে তা জরিমানা গণ্য করে এবং তোমাদের বিপর্যয়ের প্রতীক্ষা করে। তাদের উপরই হোক নিকৃষ্টতম বিপর্যয় [১]। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতেও এ সমস্ত বেদুঈনেরই একটি অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এরা যাকাত, জিহাদ প্রভৃতিতে যে অর্থ ব্যয় করে, তাকে এক প্রকার জরিমানা বলে মনে করে। তার কারণ, তাদের অন্তরে তো ঈমান নেই, শুধু নিজেদের কুফরীকে লুকানোর জন্য সালাতও পড়ে নেয় এবং ফরয যাকাতও দিয়ে দেয়। কিন্তু মনে এ কালিমা থেকেই যায় যে, এ অর্থ অনর্থক খরচ হয়ে গেল। আর সেজন্য অপেক্ষায় থাকে যে, কোনো রকমে মুসলিমদের উপর কোনো বিপদ নেমে আসুক এবং তারা পরাজিত হয়ে থাক; তাহলেই আমাদের এহেন অর্থদণ্ড থেকে মুক্তিলাভ হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের উত্তরে বলছেন, তাদেরই উপর মন্দ অবস্থা আসবে। আর এরা নিজেদের সেসব কাজ-কর্ম ও কথা-বার্তার কারণে অধিকতর অপমানিত। মুমিনদের জন্য রয়েছে তাদের শক্রদের বিপরীতে উত্তম ফলাফল। [দেখুন, আইসারুত তাফাসীর; সা’দী]
আর মরুবাসীদের কেউ কেউ আল্লাহ্ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তাকে আল্লাহ্র সান্নিধ্য ও রাসূলের দো’আ লাভের উপায় গণ্য করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় তা তাদের জন্য আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের উপায়; অচিরেই আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ রহমতে দাখিল করবেন [১]। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [২]।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা সে সব বেদুঈনের আলোচনা সংগত মনে করেছেন যারা সত্যিকার ও পাকা মুসলিম। আর তা এজন্য যাতে একথা প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, সব বেদুঈনই এক রকম নয়। তাদের মধ্যেও নিঃস্বার্থ, নিষ্ঠাবান ও জ্ঞানী লোক আছে। তাদের অবস্থা হল এই যে, তারা যে যাকাত-সদকা দেয়, তাকে তারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের উপায় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোআ প্রাপ্তির আশায় দিয়ে থাকে। ইবন আব্বাস বলেন, এখানে (وَ صَلَوٰتِ الرَّسُوۡلِ) বলে রাসূল তাদের জন্য যে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন সেটা বোঝানো হয়েছে। [তাবারী]।
[২] আলোচ্য আয়াত থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা পাই। এক. বেদুঈনরাও শহরবাসীর মতই। তাদের মধ্যেও ভালো-খারাপ উভয় ধরনের লোক রয়েছে। সুতরাং তারা বেদুঈন হয়েছে বলেই তাদের দুর্নাম করা হয়নি- বরং তারা আল্লাহর নির্দেশ না জানাটাই তাদের নিন্দার কারণ। দুই. কুফর ও নিফাক অবস্থাভেদে বেশী, কম, কঠোর ও হাল্কা হয়ে থাকে। তিন. এ আয়াত দ্বারা ইলমের সম্মান বুঝা যাচ্ছে। যার ইলম নেই সে ক্ষতির অধিক নিকটবর্তী সে লোকের তুলনায়, যার কাছে ইলম আছে। আর এজন্যই আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। চার. এ আয়াত থেকে আরও বুঝা যায় যে, উপকারী ইলম সেটাই যা মানুষের কাজে লাগে, যা থাকলে মানুষ আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা জানতে পারে। যেমন, ঈমান, ইসলাম, ইহসান, তাকওয়া, সফলতা, আনুগত্য, সৎ, সুসম্পর্ক সম্পর্কে জ্ঞান। অনুরূপভাবে, কুফর, নিফাক, ফিসক, অবাধ্যতা, ব্যভিচার, মদ, সুদ ইত্যাদি সম্পর্কে জানা; কেননা এগুলো জানলে আল্লাহর নির্দেশগুলো মানা যায়, আর নিষেধকৃত বস্তুগুলো পরিত্যাগ করা যায়। পাঁচ. ঈমানদারের উচিত তার কর্তব্যকর্ম অত্যন্ত খুশীমনে আদায় করা। সে সবসময় খেয়াল রাখবে যে সে এগুলো করতে পেরে লাভবান, ক্ষতিগ্রস্ত নয়। [সা'দী]
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী [১] এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে [২] আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন [৩]। আর তিনি তাদের জন্য তৈরী করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য।
টীকা দেখুন
[১] এ আয়াতে সাহাবীগণের প্রশংসায় আল্লাহ্ তা'আলা “সাবেকীন আওয়ালীন" বা ‘প্রথম অগ্রগামী’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এ “সাবেকীন আওয়ালীন কারা তা নির্ধারণে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়।
(ক) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এ আয়াতে “সাবেকীন আওয়ালীন" এর পরে
(مِنَ الۡمُهٰجِرِیۡنَ وَ الۡاَنۡصَارِ)
বাক্যে ব্যবহৃত مِنْ অব্যয়টি কারো কারো মতে تبعيض বা কিছু সংখ্যক বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এ তাফসীর অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরামের দুটি শ্রেণী সাব্যস্ত হয়েছে। একটি হল সাবেকীনে আওয়ালীনের, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কেবলা পরিবর্তন কিংবা গাযওয়ায়ে বদর অথবা বাইআতে রেদওয়ান অথবা মক্কা বিজয়ের পরে যারা মুসলিম হয়েছে তারা সবাই। তখন সাহাবাগণ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত হবেন,
এক) মুহাজেরীন ও আনসারদের মধ্যে যারা “সাবেকীন আওয়ালীন” বা ঈমান গ্রহণে ও হিজরতে অগ্রবর্তী।
দুই) অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম। এ তাফসীর অনুসারে সাহাবীগণের মধ্যে কারা “সাবেকীন আওয়ালীন” বলে গণ্য হবেন এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি মত রয়েছে:
১) কোনো কোনো মনীষী সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে "সাবেকীন আওয়ালীন” তাদেরকেই সাব্যস্ত করেছেন, যারা উভয় কেবল অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাস ও কাবার দিকে মুখ করে সালাত পড়েছেন। অর্থাৎ যারা কেবলা পরিবর্তনের পূর্বে মুসলিম হয়েছে তাদেরকে “সাবেকীন আওয়ালীন" গণ্য করেছেন। এমনটি হল সাঈদ ইবন মুসাইয়োব ও কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু— এর মত। [কুরতুবী]
২) আতা ইবন আবী রাবাহ বলেছেন যে, ‘সাবেকীনে আওয়ালীন’ হলেন সে সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। [কুরতুবী]
৩) ইমাম শা'বী রাহিমাহুল্লাহ এর মতে যেসব সাহাবী হুদায়বিয়ার বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারাই সাবেকীন আওয়ালীন। [কুরতুবী] লক্ষণীয় যে, সবার নিকটই যারা কিবলা পরিবর্তনের আগে হিজরত করেছেন তারা নিঃসন্দেহে ‘সাবেকীন আওয়ালীন’। আর যারাই বাই’আতে রিদওয়ান তথা হুদায়বিয়ার পরে হিজরত করেছেন তারা সবার মত অনুযায়ীই মুহাজির হোক বা আনসার সাবেকীনে আওয়ালীনের পর দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। তবে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হচ্ছে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধির আগে যারা হিজরত করেছে তারা সবাই ‘সাবেকীনে আওয়ালীন’। [ইবন তাইমিয়্যাহ, মিনহাজুস সুন্নাহ ১/১৫৪-১৫৫]
খ) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এ আয়াতে مِنْ অব্যয়টি আংশিক বুঝানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়নি বরং বিবরণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। তখন এর মর্ম হবে, সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম অন্যান্য সমস্ত উম্মতের তুলনায় সাবেকীনে আওয়ালীন। এ তাফসীরের মর্ম হল, সাহাবায়ে কেরামই হলেন মুসলিমদের মধ্যে সাবেকীনে আওয়ালীন। কারণ, ঈমান আনার ক্ষেত্রে তাঁরাই সমগ্র উম্মতের অগ্রবর্তী ও প্রথম। পরবর্তী কিয়ামত পর্যন্ত সবাই তাবেয়ীন বা তাদের অনুসারী। [ফাতহুল কাদীর]
[২] অর্থাৎ যারা আমল ও চরিত্রের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে অগ্রবর্তী মুসলিমদের অনুসরণ করেছে পরিপূর্ণভাবে। উপরোক্ত প্রথম তফসীর অনুযায়ী “যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে” বলে হুদায়বিয়ার সন্ধি পরবতী সে সমস্ত সাহাবী এবং মুসলিম, যারা কেয়ামত অবধি ঈমান গ্রহণ, সৎকর্ম ও সচ্চরিত্রের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের উপর চলবে এবং পরিপূর্ণভাবে তাদের অনুসরণ করবে, তাদের সবাইকে বুঝানো হয়েছে। [কুরতুবী] আর উপরোক্ত দ্বিতীয় তফসীর অনুযায়ী এর দ্বারা সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী মুসলিমগণ অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে পারিভাষাগতভাবে তাবেয়ী' বলা হয়। এরপর পরিভাষাগত এই তাবেয়ীগণের পর কেয়ামত অবধি আগত সে সমস্ত মুসলিমও এর অন্তর্ভুক্ত যারা ঈমান ও সৎকর্মের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে সাহাবায়ে কেরামের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে। [ফাতহুল কাদীর]
[৩] সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত। যদি দুনিয়াতে তাদের কারো দ্বারা কোনো ক্রটি-বিচ্যুতি হয়েও থাকে তবুও। এর প্রমাণ হলো কুরআন কারীমের এ আয়াত। এতে শর্তহীনভাবে সমস্ত সাহাবা সম্পর্কেই বলা হয়েছে যে,
(رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡهُمۡ وَ رَضُوۡا عَنۡهُ)
অবশ্য তাবেয়ীনদের ব্যাপারে বলেছেন,
(وَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡهُمۡ بِاِحۡسَانٍ)
“যারা সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে"। সুতরাং তাবেয়ীনদের ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের পরিপূর্ণ সুন্দর অনুসরণের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবায়ে কেরামের সবাই কোনো রকম শর্ত ছাড়াই আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিধন্য। এ ব্যাপারে আরও প্রমাণ হলো, আল্লাহ্ তা’আলার বাণী:
(لَقَدۡ رَضِیَ اللّٰہُ عَنِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ یُبَایِعُوۡنَکَ تَحۡتَ الشَّجَرَۃِ)
“অবশ্যই আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন মুমিনদের থেকে, যখন তারা গাছের নীচে আপনার হাতে বাই’আত হচ্ছিল।” [সূরা আল-ফাতহ ১৮] অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা সূরা মুজাদালাহর ২২ নং আয়াতেও সাহাবীগণের প্রশংসা করে তাদের উপর সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন। এছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের জান্নাতী হওয়ার ব্যাপারে আরো স্পষ্ট দলীলের মধ্যে রুয়েছে, আল্লাহ্র বাণী:
( لَا یَسۡتَوِی الۡقٰعِدُوۡنَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ غَیۡرُ اُولِی الضَّرَرِ وَ الۡمُجٰهِدُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِاَمۡوَالِهِمۡ وَ اَنۡفُسِهِمۡ ؕ فَضَّلَ اللّٰہُ الۡمُجٰهِدِیۡنَ بِاَمۡوَالِهِمۡ وَ اَنۡفُسِهِمۡ عَلَی الۡقٰعِدِیۡنَ دَرَجَةً ؕ وَ کُلًّا وَّعَدَ اللّٰہُ الۡحُسۡنٰی)
“মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন; তাদের প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ হুসনা’ বা সবচেয়ে ভাল পরিণামের ওয়াদা করেছেন।” [সূরা আন-নিসা ৯৫] অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা অন্যত্র আরো বলেন,
(لَا یَسۡتَوِیۡ مِنۡکُمۡ مَّنۡ اَنۡفَقَ مِنۡ قَبۡلِ الۡفَتۡحِ وَ قٰتَلَ ؕ اُولٰٓئِکَ اَعۡظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِیۡنَ اَنۡفَقُوۡا مِنۡۢ بَعۡدُ وَ قٰتَلُوۡا ؕ وَ کُلًّا وَّعَدَ اللّٰہُ الۡحُسۡنٰی)
“তোমাদের মধ্যে যারা ফাতহ তথা হুদায়বিয়ার সন্ধির আগে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে, তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়। তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাদের চেয়ে, যারা পরবর্তী কালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়ের জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [সূরা আল-হাদীদ ১০] এতে বিস্তারিত এভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরাম প্রাথমিক পর্যায়ের হোন কিংবা পরবতী পর্যায়ের, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের সবার জন্যই জান্নাতের ওয়াদা করেছেন।