মূল বিষয়বস্তুতে যান

নুরুল কালাম একাডেমিতে আপনাকে স্বাগতম

০১৫৭৭৩০১১৬১

তৃতীয় ভাগ · নিজের জন্য রুকইয়াহ

অধ্যায় ১৫

একটি সহজ দৈনিক রুকইয়াহ রুটিন

সালাত, সকাল-সন্ধ্যার আমল, ঘুমের আমল ও নির্বাচিত পাঠকে ধারাবাহিক জীবনের অংশ করা।

৬টি প্রশ্নপ্রায় ৪ মিনিটের পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

নিজের জন্য রুকইয়াহ শুরু করার পর অনেকেই জানতে চান, “এখন প্রতিদিন কী করব?” একটি সহজ পরিকল্পনা থাকলে মনে রাখা সুবিধা হয়। কিন্তু নিজের সুবিধামতো বানানো পরিকল্পনাকে সুন্নাহর নির্ধারিত তালিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা-পদ্ধতি বলা যাবে না।

আগের অধ্যায়ে আল-ফাতিহা, ঘুমের আগে তিন সূরা এবং নির্দিষ্ট ব্যথার দোয়ার দলিল ও পদ্ধতি দেখেছি। এখানে সেগুলো নতুন নিয়মে বাঁধব না। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে কীভাবে প্রমাণিত পাঠ, ব্যক্তিগত দোয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জায়গা রাখা যায়, তার একটি নমনীয় উদাহরণ দেখব।

১. রুটিনের আগে সীমাটি বুঝুন

যে আমলের সময় বা সংখ্যা দলিলে এসেছে, সেটি সেই আমলের ক্ষেত্রেই মানুন। যেমন ঘুমের আগে তিন সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলানোর বর্ণনায় পুরো আমলটি তিনবার এসেছে। (সহিহ আল-বুখারি, ৫০১৭) নির্দিষ্ট ব্যথার দোয়ায় প্রথম বাক্য তিনবার ও পরের বাক্য সাতবার এসেছে। (সহিহ মুসলিম, ২২০২) এগুলোর বিস্তারিত অধ্যায় ১৪-তে আছে।

অন্যদিকে “সকাল আটটায় পাঁচ মিনিট”, “প্রতি পাঠের পর দশ মিনিট অপেক্ষা” কিংবা “এই তালিকাটি টানা চল্লিশ দিন”। এসব সংখ্যা এই অধ্যায়ের উদাহরণে থাকলে তা কেবল ব্যক্তিগত পরিকল্পনা হতো; নববী নির্দেশ হতো না। তাই আমরা এমন বাধ্যতামূলক সংখ্যা দিচ্ছি না। আপনার স্বাস্থ্য, কাজ, যত্নের দায়িত্ব ও সক্ষমতা অনুযায়ী সময় বেছে নিন।

২. দিনের একটি সহজ ছক

সকালে বা দিনের সুবিধাজনক সময়ে: আপনি যে কুরআন সঠিকভাবে পড়তে জানেন, তা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় শিফা, হেফাজত ও সাহায্য চান। আল-ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহর দলিল অধ্যায় ২-এ এবং নিজের জন্য শুরু করার ব্যবহারিক দিক অধ্যায় ১৪-তে আছে। এই সময় বেছে নেওয়া আপনার সুবিধা; এই ছকের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট সকালবেলার সংখ্যা দাবি করা হচ্ছে না।

দিনে প্রয়োজন দেখা দিলে: শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা হলে এবং সেখানে হাত রাখা সম্ভব ও নিরাপদ হলে অধ্যায় ১৪-তে বর্ণিত দোয়াটি তার নিজস্ব পদ্ধতিতে পড়তে পারেন। অন্য কষ্ট হলে নিজের জানা প্রমাণিত দোয়া পড়ুন। সব সমস্যার জন্য একই দোয়া, একই সংখ্যা বা একই শরীরী প্রতিক্রিয়া বাধ্যতামূলক মনে করবেন না।

ঘুমানোর আগে: তিন সূরার যে আমলটি হাদিসে আছে, তা করতে পারেন। দুই হাত একত্র করে আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস পড়া, হাতে হালকা ফুঁ দেওয়া এবং যতটুকু সম্ভব শরীরে হাত বুলিয়ে নেওয়ার বর্ণনা অধ্যায় ১৪-তে রয়েছে। পুরো আমলটি তিনবার করার দলিল সেখানেই দেওয়া আছে। (সহিহ আল-বুখারি, ৫০১৭)

এটি একটি নমুনা ছক। দিনে কাজের মধ্যে দোয়া করতে পারলে করুন; কোনো অংশ বাদ পড়লে নিজেকে দোষী ভেবে আতঙ্কিত হবেন না। বিশেষত অসুস্থ বা ক্লান্ত অবস্থায় সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করুন।

৩. ছোট করে শুরু করলেও চলবে

আজ হয়তো আপনি অল্প কিছু পড়তে পারবেন। যতটুকু সঠিকভাবে জানেন, সেখান থেকে শুরু করুন। রুকইয়াহর জন্য বিশেষ বোতল, আলাদা ঘর, দীর্ঘ অডিও বা অন্য কারও উপস্থিতি প্রথম শর্ত নয়। নিজের পড়া সম্ভব না হলে বিশ্বস্ত কারও সহায়তা নেওয়ার সুযোগও আছে; অধ্যায় ১৩-তে এর দলিল আলোচনা হয়েছে।

আরবি উচ্চারণ শেখার প্রয়োজন থাকলে ধীরে ধীরে শিখুন। অর্থ বুঝতে চেষ্টা করুন এবং নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। না জানা আরবি শব্দ অনুমান করে যোগ করবেন না, আর কেবল রোমান হরফ দেখে পড়াটিকেই নির্ভুল উচ্চারণ ধরে নেবেন না। পাঠের মানে হলো আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া; নিখুঁত “সেশন” বানানোর চাপ নেওয়া নয়।

৪. রুটিন মাপার ভুল পদ্ধতি

পড়ার সময় কাঁপুনি, কান্না, হাই, স্বপ্ন বা অন্য কোনো অনুভূতি হলো কি না। এগুলো দিয়ে জিন, জাদু বা নজরের নিশ্চিত পরিচয় পাওয়া যায় না। আবার কিছুই অনুভব না করলে আপনার দোয়া বৃথা গেল, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। বারবার নিজের শরীর পরীক্ষা করতে গিয়ে ভয় বাড়লে সেই পরীক্ষা থামান এবং স্বাভাবিক কাজের দিকে ফিরুন।

“আজ কতবার পড়েছি” লিখে রাখা আপনার ব্যক্তিগত স্মরণে সাহায্য করলে রাখতে পারেন। কিন্তু সেই সংখ্যা দিয়ে নিজের ঈমান, রোগের কারণ বা শিফার নিশ্চয়তা বিচার করবেন না। কাউকে আপনার জন্য কোনো ফলের সময়সীমা ঘোষণা করতেও দেবেন না।

৫. চিকিৎসা, বিশ্রাম ও সহায়তার জায়গা

চিকিৎসকের পরামর্শ, নির্ধারিত ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, খাবার ও বিশ্রামকে রুটিনের বাইরে সরিয়ে রাখবেন না। চিকিৎসা চলার মধ্যেও কুরআন ও দোয়া পড়া যায়। নতুন বা তীব্র বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে রুকইয়াহর নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিন; অধ্যায় ৪ ও ২৭-এ সাহায্য নেওয়ার পথ দেখানো হয়েছে।

দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। নিজের কষ্টের কথা বিশ্বাসযোগ্য মানুষকে জানানোও সাহায্য পাওয়ার একটি পথ। রুটিন তখনই সহায়ক, যখন তা চিকিৎসা ও জীবনের প্রয়োজনীয় কাজের সঙ্গে চলতে পারে।

৬. আপনার নিজের পরিকল্পনা লিখে নিন

তিনটি প্রশ্ন নিজেকে করুন:

* কোন প্রমাণিত পাঠ বা দোয়া আমি সঠিকভাবে জানি?

* কোন সময়ে আমার পক্ষে শান্তভাবে পড়া সম্ভব?

* আমার চিকিৎসা, বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সাহায্যের পরিকল্পনা কী?

উত্তর লিখে রাখলে সংক্ষিপ্ত রাখুন। যেমন: “সুবিধামতো সময়ে আল-ফাতিহা পড়ে দোয়া করব; ঘুমের আগে তিন সূরার আমল করব; প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেব।” এখানে প্রথম সময়টি আপনার বেছে নেওয়া; ঘুমের আমলের পদ্ধতি হাদিসে বর্ণিত। দুই ধরনের কথা এক করে ফেলবেন না।

কোনো দিন সময় বা শক্তি কম থাকলে পরিকল্পনা বদলাতে পারেন। রুটিন আপনার সহায়তার জন্য; রুটিন ঠিকমতো না চলায় আপনাকে ব্যর্থ ঘোষণা করার জন্য নয়।

মনে রাখুন

* প্রমাণিত আমলের নিজস্ব সময় ও সংখ্যা থাকলে কেবল সেই আমলেই তা প্রয়োগ করুন।

* নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নিতে পারেন; তাকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বলবেন না।

* সামর্থ্য অনুযায়ী পড়ুন, ফলের নিশ্চয়তা বা সময়সীমা বানাবেন না।

* অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া দিয়ে অদৃশ্য কারণ নির্ণয় করবেন না।

* চিকিৎসা, বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তা চালিয়ে যান।

পরের অধ্যায়ে

একটি সহজ রুটিন নিজের জন্য সাজালাম। পরের অধ্যায়ে রুকইয়াহর সময় কোনো অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া হলে তা কীভাবে বুঝবেন, আর কখন প্রয়োজনীয় সাহায্য নেবেন, সে বিষয়ে আলোচনা করব।

অধ্যায় ১৬: রুকইয়াহর সময় কিছু অনুভব করলে কী বুঝবেন?

রুকইয়াহর সময় কিছু অনুভব করলে কী বুঝবেন?

তথ্যসূত্র

১. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫০১৭: ঘুমের আগে তিন সূরা, হাতে ফুঁ, শরীরে হাত বুলানো ও তিনবার করার বর্ণনা।

২. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০২: নির্দিষ্ট ব্যথার দোয়ায় প্রথম বাক্য তিনবার ও পরের বাক্য সাতবার পড়ার বর্ণনা।

৩. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৭৩৬: আল-ফাতিহা দিয়ে রুকইয়াহর অনুমোদন; মূল ঘটনা অধ্যায় ২-এ।

পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?

রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।

পরামর্শ বুক করুন
বইয়ের সূচিতে ফিরুন