মূল বিষয়বস্তুতে যান

নুরুল কালাম একাডেমিতে আপনাকে স্বাগতম

০১৫৭৭৩০১১৬১

তৃতীয় ভাগ · নিজের জন্য রুকইয়াহ

অধ্যায় ১৬

রুকইয়াহর সময় কিছু অনুভব করলে কী বুঝবেন?

কান্না, হাই, কাঁপুনি, ঘুম বা অন্য অনুভূতিকে observation হিসেবে দেখা, diagnosis হিসেবে নয়।

৬টি প্রশ্নপ্রায় ৪ মিনিটের পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

কুরআন পড়ছিলেন। হঠাৎ চোখে পানি এল, শরীর কেঁপে উঠল কিংবা বুক ধড়ফড় করতে লাগল। পাশে কেউ বললেন, “দেখলেন তো, আপনার সমস্যা ধরা পড়েছে।” কথাটি শুনে আপনার ভয় আরও বেড়ে গেল।

আবার আরেকজন পড়লেন, কিন্তু বিশেষ কিছুই অনুভব করলেন না। তাঁর মনে হলো, “তাহলে কি আমার পাঠে কোনো কাজ হচ্ছে না?”

দুটি সিদ্ধান্তই তাড়াহুড়োর। কোনো অনুভূতি হলে সেটি আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, তাকে অস্বীকার করার দরকার নেই। কিন্তু অনুভূতির ভিত্তিতে একাই জিন, জাদু বা বদনজরের কারণ নিশ্চিত করা যায় না। কিছু অনুভব না হওয়াও দোয়া কবুল হয়নি বা রুকইয়াহ ব্যর্থ হয়েছে, এমন প্রমাণ নয়।

১. অনুভূতি আর কারণ এক জিনিস নয়

রুকইয়াহর সময় কেউ শান্তি অনুভব করতে পারেন; কারও কান্না, অস্বস্তি, ক্লান্তি বা ভয় বাড়তে পারে। আবার অনেকের কিছুই আলাদা লাগে না। আগে থেকে অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, ঘুমের ঘাটতি, পরিবেশ, অন্যের কথা বা নিজের প্রত্যাশাও তখনকার অনুভূতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই শুধু ঘটনাটির সময় দেখে তার একটিই কারণ ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

বুক ধড়ফড় ও কাঁপুনি উদ্বেগের সময়ও দেখা যেতে পারে। মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গের অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে। লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করবেন না। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উদ্বেগজনিত সমস্যা)

একটি সহজ প্রশ্ন মনে রাখুন: “আমি কী অনুভব করেছি?” এবং “এর কারণ কী?” প্রথমটির উত্তর আপনি বলতে পারবেন; দ্বিতীয়টির জন্য কখনো চিকিৎসা-পরামর্শ ও আরও তথ্য প্রয়োজন হবে।

২. প্রতিক্রিয়া দিয়ে অদৃশ্য রোগের তালিকা বানাবেন না

“হাই তুললে বদনজর”, “কাঁদলে জিন”, “বমি এলে জাদু”, “কিছু না হলে ঈমান দুর্বল” এমন নিয়ম এই বই শেখায় না। একই অনুভূতি ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন কারণে হতে পারে। অন্য কারও অভিজ্ঞতা আপনার জন্য পরীক্ষার মানদণ্ড নয়।

আপনি যদি কোনো অডিও বা রাকির সঙ্গে পড়েন, তাঁর অনুমানকে পরীক্ষায় পাওয়া রোগনির্ণয়ের মতো গ্রহণ করবেন না। ভয় দেখিয়ে নির্দিষ্ট রোগের নাম দেওয়া, পরিবারে কাউকে দায়ী করা বা নির্দিষ্ট টাকা ও সেশনের প্রতিশ্রুতি আদায় করার চেষ্টা থেকে দূরে থাকুন। রুকইয়াহর নামে প্রচলিত ভুল ও সেবা বাছাই নিয়ে অধ্যায় ২৪ ও ২৫-এ বিস্তারিত আলোচনা হবে।

৩. অস্বস্তি হলে তখন কী করবেন?

প্রথমে পড়া থামিয়ে বা বিরতি নিয়ে নিজের অবস্থাটি দেখুন। আরাম করে বসুন, আশপাশ নিরাপদ কি না দেখুন, প্রয়োজনে বিশ্বাসযোগ্য কাউকে জানান। অস্বস্তি কমলে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী আবার পড়তে পারেন; না পারলে পরে পড়ুন। বিরতি নেওয়ার জন্য নিজেকে দোষ দেবেন না।

কেউ পাশে থাকলে তাঁকে আপনার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলতে বলুন। চিৎকার, জোরে ধরে রাখা, ধাক্কা দেওয়া বা অনিচ্ছায় দীর্ঘ সেশন চালানো গ্রহণযোগ্য সহায়তা নয়। শিশুর কষ্ট বা ভয়কে “ভেতর থেকে কিছু বের হচ্ছে” বলে চাপ দেবেন না। শিশু ও পরিবারের সতর্কতার জন্য অধ্যায় ১২ দেখুন।

যদি বারবার এমন অভিজ্ঞতা হয়, কখন হয়েছিল, কী অনুভব করেছিলেন এবং কতক্ষণ ছিল, তা সংক্ষেপে লিখে রাখতে পারেন। এটি চিকিৎসককে নিজের অবস্থা জানাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সেই নোটকে জিন বা জাদুর “প্রমাণের খাতা” বানাবেন না।

৪. কখন দ্রুত চিকিৎসা দরকার?

নতুন বা তীব্র বুকব্যথা, গুরুতর শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, খিঁচুনি কিংবা নিজের ক্ষতির আশঙ্কা হলে রুকইয়াহ সেশন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত উপযুক্ত জরুরি সহায়তা নিন। একে কেবল “রুকইয়াহর প্রতিক্রিয়া” ভেবে বসে থাকবেন না। বিপদের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা অধ্যায় ৪-এ এবং চিকিৎসা ও মানসিক-স্বাস্থ্য সহায়তার বিস্তারিত অধ্যায় ২৭-এ আছে।

উপসর্গ জরুরি মনে না হলেও যদি বারবার ফিরে আসে, দীর্ঘস্থায়ী হয় বা কাজ, পড়াশোনা, ঘুম ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। ইতিমধ্যে চিকিৎসা চললে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না। দোয়া ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা একসঙ্গে চলতে পারে।

৫. কিছুই অনুভব না হলে?

তাতে আপনি অন্যদের চেয়ে কম ঈমানদার হয়ে যান না। প্রত্যেকের কান্না, শারীরিক অনুভূতি ও মনোযোগ এক রকম হয় না। কুরআন পাঠ ও আল্লাহর কাছে দোয়াকে এমন কোনো পরীক্ষা বানাবেন না, যেখানে নির্দিষ্ট অনুভূতি হলেই “পাস”।

নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করতে পারেন, “আমি কি প্রমাণিত পাঠ পড়ছি, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছি, নিজের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দিকে খেয়াল রাখছি?” এগুলো আপনার করণীয় নিয়ে প্রশ্ন। “আজ হাই কয়বার উঠল?” দিয়ে অদৃশ্য কারণ মাপার প্রশ্ন নয়।

৬. অন্য কেউ আপনাকে কী বললে সতর্ক হবেন?

কেউ যদি আপনার একটি প্রতিক্রিয়া দেখে সঙ্গে সঙ্গে বলে দেন কে জাদু করেছে, কার নজর লেগেছে কিংবা আপনার ভেতরে কী আছে, তাঁর দাবির ভিত্তি জানতে চান। সন্দেহের ওপর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন না। ভয় বাড়িয়ে আপনাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ কারও পরামর্শ নিন।

নিজের সীমাও বলুন: “এখন আমি বিরতি চাই”, “আমাকে ধরে রাখবেন না”, “চিকিৎসার প্রয়োজন হলে আমি যাব।” অসুস্থ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আগে। অন্যের সেবা নেওয়ার সিদ্ধান্তেও আপনার বোঝাপড়া ও সম্মতি জরুরি।

এখন কী করবেন?

* যা অনুভব করেছেন, সেটি শান্তভাবে বলুন; নিজের থেকে কারণের নাম দেবেন না।

* অস্বস্তি বাড়লে বিরতি নিন এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত কাউকে জানান।

* নতুন, তীব্র বা বিপজ্জনক উপসর্গে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

* কোনো প্রতিক্রিয়াকে রাকির নিশ্চিত রোগনির্ণয় বা নির্দিষ্ট ফলের প্রমাণ মানবেন না।

মনে রাখুন

রুকইয়াহর সময় অনুভূতি হতে পারে, নাও হতে পারে। অনুভূতি বাস্তব হলেও তার ব্যাখ্যা সব সময় স্পষ্ট নয়। ভয় বা কৌতূহলের চাপে অনিশ্চিত বিষয়কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পরিণত করবেন না।

পরের অধ্যায়ে

কিছু অনুভব করলেন কি না, সেই প্রশ্নের পর প্রায়ই আরেকটি প্রশ্ন আসে: “এত দিন পড়ছি, ফল পেতে দেরি হচ্ছে কেন?” অধ্যায় ১৭-তে সবর, তাওয়াক্কুল, ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজন হলে পরিকল্পনা নতুন করে দেখার কথা বলব।

অধ্যায় ১৭: ফল পেতে দেরি হলে কী করবেন? সবর, তাওয়াক্কুল ও ধারাবাহিকতা

ফল পেতে দেরি হলে কী করবেন? সবর, তাওয়াক্কুল ও ধারাবাহিকতা

তথ্যসূত্র

১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ‘উদ্বেগজনিত সমস্যা’: উদ্বেগের শারীরিক লক্ষণ হিসেবে বুক ধড়ফড় ও কাঁপুনির আলোচনা; চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।

২. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ, ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ২০২১’: আত্মক্ষতির চিন্তা থাকলে দ্রুত বিশ্বস্ত মানুষ বা স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নেওয়ার নির্দেশনা।

৩. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), Basic Emergency Care: গুরুতর শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা ও অচেতনতার মতো বিপদে দ্রুত মূল্যায়নের নির্দেশনা।

পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?

রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।

পরামর্শ বুক করুন
বইয়ের সূচিতে ফিরুন