মূল বিষয়বস্তুতে যান

নুরুল কালাম একাডেমিতে আপনাকে স্বাগতম

০১৫৭৭৩০১১৬১

তৃতীয় ভাগ · নিজের জন্য রুকইয়াহ

অধ্যায় ১৭

ফল পেতে দেরি হলে কী করবেন? সবর, তাওয়াক্কুল ও ধারাবাহিকতা

সবর, তাওয়াক্কুল, বৈধ চিকিৎসা ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া।

৫টি প্রশ্নপ্রায় ৪ মিনিটের পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

আপনি দোয়া করছেন, কুরআন পড়ছেন, চিকিৎসাও নিচ্ছেন। তবু কষ্ট রয়ে গেছে। তখন মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক: “আমি কি ভুল করছি? আর কত দিন অপেক্ষা করব?”

কষ্ট দীর্ঘ হলে এমন প্রশ্ন মানুষকে ক্লান্ত করে। উত্তর দিতে গিয়ে কেউ যদি বলে, “আর সাত দিন এই কাজ করলেই নিশ্চিত ভালো হবেন”, সেটি আশ্বাসের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া শিফার দিনক্ষণ বলা যায় না। আবার ফল দেরি হচ্ছে বলে আপনাকে দোষী করা বা আপনার ঈমানের মাপ নেওয়াও ঠিক নয়।

এই অধ্যায়ের কথা হলো: আল্লাহর কাছে শিফা চাইতে থাকুন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তার পথ খোলা রাখুন, আর সময়ের হিসাব দিয়ে নিজের ইবাদতের মূল্য বিচার করবেন না।

১. সবর মানে কী?

কুরআনে বিশ্বাসীদের সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩) অসুস্থতা বা দুশ্চিন্তায় সবর হলো কষ্টকে অস্বীকার না করে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া এবং নিজের করণীয় থেকে সরে না আসা। কষ্ট হচ্ছে বলা, কান্না করা বা সাহায্য চাওয়া সবরের বিপরীত নয়।

সুহাইব (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী ﷺ মুমিনের অবস্থার কথা বলেছেন: ভালো অবস্থায় কৃতজ্ঞতা এবং কষ্টে ধৈর্য, উভয় অবস্থায় তাঁর জন্য কল্যাণ রয়েছে। (সহিহ মুসলিম, ২৯৯৯) এই হাদিস কষ্টকে তুচ্ছ করে না। এটিও বলে না যে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেরে উঠবেন।

আজ ব্যথা বেশি, মন ক্লান্ত বা পড়ার শক্তি কম হলে যতটুকু পারেন করুন। প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নিন। ধৈর্যের নামে নিজেকে অতিরিক্ত কষ্টে ফেলবেন না কিংবা অন্য কাউকে তা করতে বলবেন না।

২. তাওয়াক্কুলের সঙ্গে চিকিৎসা কীভাবে থাকবে?

ইবরাহিম (আ.)-এর কথায় কুরআন শিক্ষা দেয়, অসুস্থ হলে আল্লাহই শিফা দেন। (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮০) শিফার মালিক আল্লাহ, আর বান্দা তাঁর অনুমোদিত উপায় গ্রহণ করে। উপায়গুলোর মধ্যে দোয়া ও প্রমাণিত রুকইয়াহ আছে; প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও আছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার চিকিৎসার উপায়ও সৃষ্টি করেননি। (সহিহ আল-বুখারি, ৫৬৭৮) এই বর্ণনাকে “আমার রোগের সঠিক চিকিৎসা এখনই জানা আছে” বা “সবাই অবশ্যই সুস্থ হবে” এমন প্রতিশ্রুতি বানাবেন না। অসুস্থতা বোঝা ও উপযুক্ত চিকিৎসা খোঁজার গুরুত্ব এখান থেকে বোঝা যায়।

আগের ওষুধে উপকার না হলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজন হলে রোগের ব্যাখ্যা, চিকিৎসার পরিকল্পনা বা অন্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানতে চান। দীর্ঘদিনের কষ্টে মানসিক চাপ বাড়লেও তা বলা যায়; সহায়তা চাওয়া তাওয়াক্কুলের অভাব নয়।

৩. “আরও বেশি” সব সময় উত্তর নয়

কেউ হয়তো কয়েক দিন নিয়মিত পড়ার পর ভাবছেন, “যেহেতু ভালো হচ্ছি না, প্রতিদিন অনেক ঘণ্টা পড়তে হবে।” আরেকজন সব কাজ ফেলে পরের রাকির খোঁজে চলেছেন। এতে প্রয়োজনীয় ঘুম, কাজ, পরিবার বা চিকিৎসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিকল্পনাটি নতুন করে দেখা দরকার।

আপনার সুবিধামতো করা দৈনিক রুটিন অধ্যায় ১৫-তে আছে। সেখানে প্রমাণিত আমলের নিজস্ব নিয়ম এবং আপনার ব্যক্তিগত সময় বাছাই আলাদা রাখা হয়েছে। দেরি হলে নতুন বাধ্যতামূলক সংখ্যা, গোপন দোয়া, অজানা তাবিজ বা ব্যয়বহুল সেশন যোগ করতেই হবে, এমন নয়।

একইভাবে একদিন কম পড়তে পারা মানে আগের সব দোয়া নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। যতটুকু সামর্থ্য আছে, শান্তভাবে সেখানে ফিরে আসুন। নিজের জন্য পড়া না গেলে বিশ্বস্ত কারও সহায়তা নিতে পারেন; অধ্যায় ১৩-তে এ বিষয়ে কথা হয়েছে।

৪. ফল বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?

কষ্ট পুরোপুরি চলে যাওয়া একটি কামনা। কিন্তু দৈনন্দিন বাস্তবতায় প্রশ্নটি একটু খুলে দেখলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত সহজ হয়। উপসর্গ কি বদলাচ্ছে? চিকিৎসকের বলা পরীক্ষা বা পরবর্তী সাক্ষাতের সময় এসেছে কি? ঘুম, কাজ ও সম্পর্ক কতটা প্রভাবিত হচ্ছে? কোনো নতুন বিপদের লক্ষণ দেখা দিয়েছে কি?

এগুলো অদৃশ্য কারণ নির্ণয়ের প্রশ্ন নয়। নিজের অবস্থা চিকিৎসককে বোঝানো এবং প্রয়োজনীয় সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন। সাময়িক স্বস্তিকে “নিশ্চিত রোগমুক্তি” বলবেন না; কষ্ট ফিরে এলে “রুকইয়াহ ব্যর্থ” সিদ্ধান্তেও পৌঁছাবেন না। চিকিৎসা-পরিকল্পনার ফল কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।

৫. দীর্ঘ অপেক্ষায় মন ভেঙে গেলে

আপনার ক্লান্ত লাগলে বিশ্বাসযোগ্য কাউকে বলুন। ব্যথা, অসুস্থতা বা উদ্বেগ দীর্ঘ হলে মন খারাপ হওয়া বোঝা যায়। নিজের কষ্ট গোপন রাখাই সবর, এমন চাপ নেবেন না। কাজকর্ম ব্যাহত হলে বা ভয় ও হতাশা বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন।

নতুন তীব্র বুকব্যথা, গুরুতর শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, খিঁচুনি বা নিজের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না; দ্রুত উপযুক্ত জরুরি সহায়তা নিন। অধ্যায় ৪-এর সংক্ষিপ্ত বিপদ-নির্দেশিকা এবং অধ্যায় ২৭-এর বিস্তারিত পথ অনুসরণ করুন।

কেউ যদি আপনার দীর্ঘ কষ্টকে কাজে লাগিয়ে বলেন, “আপনার সমস্যা খুব ভয়ংকর; কেবল আমার কাছে আরও কয়েকটি সেশন নিলেই শেষ হবে”, নিশ্চিত ফলের দলিল চাইতে পারেন এবং প্রয়োজনে সেই সেবা ছেড়ে দিতে পারেন। কারও ওপর অন্ধ নির্ভরতা তৈরি হওয়া এই বইয়ের লক্ষ্য নয়।

এখন কী করবেন?

আজ আপনার অবস্থা অনুযায়ী তিনটি কাজ বেছে নিন:

* যে প্রমাণিত পাঠ জানেন, সামর্থ্য অনুযায়ী পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে শিফা চান।

* চিকিৎসা চললে নির্ধারিত পরামর্শ মেনে চলুন; উপকার না হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ আলোচনা করুন।

* ভয়, অতিরিক্ত ব্যয় বা দীর্ঘ সেশন আপনার জীবনকে চাপে ফেললে পরিকল্পনা সহজ করুন এবং বিশ্বস্ত সাহায্য নিন।

নিজের জন্য আলাদা সময় বেছে নিতে পারেন, কিন্তু সেই সময় বা দিনসংখ্যাকে হাদিসে নির্ধারিত বলে প্রচার করবেন না। শিফার আশা রাখুন; ফলের সময় ও ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করবেন না।

মনে রাখুন

সবর আপনাকে নীরবে সব সহ্য করতে বলে না। তাওয়াক্কুল চিকিৎসা বাদ দিতে বলে না। ধারাবাহিকতা প্রতিদিন একই শক্তি নিয়ে দীর্ঘ সেশন করার নাম নয়। নিজের করণীয় যত্ন নিয়ে করতে থাকুন, আর যে ফল আপনার হাতে নেই, তা নিয়ে নিজেকে অপরাধী বানাবেন না।

পরের অধ্যায়ে

নিজের জন্য রুকইয়াহর এই ভাগ এখানেই শেষ। পরের ভাগে রুকইয়াহ ও হেফাজতে ব্যবহৃত নির্বাচিত কুরআনের আয়াতের পরিচয়, প্রাসঙ্গিকতা ও ব্যবহারের সীমা আলোচনা করব।

অধ্যায় ১৮: রুকইয়াহ ও হেফাজতে ব্যবহৃত নির্বাচিত কুরআনের আয়াত

রুকইয়াহ ও হেফাজতে ব্যবহৃত নির্বাচিত কুরআনের আয়াত

তথ্যসূত্র

১. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩: সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ।

২. আল-কুরআন, সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮০: ইবরাহিম (আ.)-এর বক্তব্যে অসুস্থতা ও আল্লাহর শিফা।

৩. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯: সুখে কৃতজ্ঞতা এবং কষ্টে ধৈর্যের মধ্যে মুমিনের কল্যাণ।

৪. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৬৭৮: রোগের সঙ্গে চিকিৎসার উপায় সৃষ্টির বর্ণনা। এই হাদিসের মূল আলোচনা অধ্যায় ১ ও ৪-এ আছে।

পর্যালোচনা করেছেন: Emad Uddin, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নিজের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চান?

রুকইয়াহ সাপোর্ট পাতায় পরামর্শের সময় বেছে নিতে পারেন।

পরামর্শ বুক করুন
বইয়ের সূচিতে ফিরুন